আমার
শৈশবের প্রথম দিন,আলোছায়ার দ্বন্দে মাখামাখি সেই অবুঝ সকাল, মায়ের বুকের
কাছাকাছি মাথা রেখে পরিচয় ঘটেছিল তার সঙ্গে। সে আমার দাদু, দিদা,
ঠাম্মা,দাভাই চারজনের অভাব পূর্ণ করেছিলো নিমেষে, না হলে হয়তো আমার শৈশব
এতটা মধুর হয়ে উঠত না। একমাত্র সন্তান হিসেবে মা বাবার স্নেহ ভালোবাসা
পেয়েছি পর্যাপ্ত পরিমাণ থেকে সহস্রগুন বেশী , সেই স্নেহ মমতা ঘেরা সকাল
সন্ধ্যায় সে ছিল বিকেলের শেকল ভাঙা বাঁশি , যে আমাকে পৌঁছে দিত কল্পনা আর বাস্তবের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত দুনিয়ায়। আমাদের বাড়িতে পিসীমনি কাজ করেছে বিশ বছর, আমার জন্মের আগে আট বছর আর পরে বারো বছর, পরে তার
ছেলে দোকান খোলার পর, সে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু তখনো প্রত্যেক বিকেলে ছুটে
আসতো আমার সাথে গল্প করতে, সন্ধ্যা অব্দি বসতো, মা চা বানাতেন, সন্ধ্যা
ঘনিয়ে এলে, চা টা খেয়ে , বিদায় নিতো, আর আমরা দুজনই অপেক্ষায় রইতাম পরের
বিকেলের। “বিকাল” শব্দটাকে সে উচ্চারণ করতো “বৈকাল” বলে, “চামচ” কে বলতো
“চামিচ”। আর্থ-সামাজিক ব্যাবধান কখনো কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি আমাদের মনে, কোনো দিন ও মনে হয় নি সে আমাদের পরিবারের নয়। আমি ডাকতাম পিসীমনি বলে কিন্তু তার আর আমার সম্পর্কটা ওখানেই থেমে থাকেনি। সে আমার কাছে ছিল বিশ্বের জানালা, আমার শিশুসুলভ অনেক চঞ্চলতার একমাত্র সাক্ষী। লাল পেড়ে সাদা শাড়ী পরিহিতা সেই পঞ্চাশোর্ধা মহিলার কোলে বসেই শুনেছি কত গল্প, শুনেছি পূর্ববঙ্গেরই ( বর্তমান বাংলাদেশ) কোনো এক জায়গায়, পদ্মার ধারে ছিল তার পিত্রালয়, তিন ভাইয়ের মৃত্যুর পর জন্ম হয়েছিল বলে, যমরাজ কে ঠকানোর আশায় মা-বাবা নাম
রেখেছিলেন নিরাশা , নিরাশা মণ্ডল। পিসীমনির কথার সুর ছিল টানা টানা,
অনেকটা ঢাকা অঞ্চলের চলিত ভাষার মতন। পিসীমনির মুখে শুনেছি, তার বিয়ে
হয়েছিল আড়াই বছর বয়েসে, পাত্র ছয় বছরের। থালায় বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল
তাকে ছাঁদনাতলায় । বিয়ের
পর নাকি স্থির হয়, মেয়ে বড় হলে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে। পনেরো বছর
বয়েসে দেশ স্বাধীন হয়, তখন সেও নিজের স্বামীর হাত ধরে ভারতে চলে আসে।
পিসীমনির গর্ব ছিল তার স্বামীর ভালবাসা , স্বামীর কথা বলা মাত্র তার দুচোখ
উজ্জ্বল হয়ে উঠত, তার কাঠের একটা ছোট্ট বাক্সে বহুবার দেখেছি সযত্ন রক্ষিত
এক কৌটো সিঁদুর, তার আন্তরিক বিশ্বাস ছিল এই সিঁদুরের ওপর, বলত ছেলেবেলায় মন্ত্রপুতঃ
এই সিঁদুরই নাকি পরতে দেওয়া হত তাকে, যাতে তার স্বামীর ভালোবাসায় ভাঁটা
না পড়ে, সেই বিশেষ সিঁদুরের একটু খানি সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল সেই
বিশ্বাসেই । সে বলতো , তার দেশের বাড়ী ছিল ছবির মতন, মাটির ছোট্ট ঘর,
বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা মাটির উঠোন, সূর্য ওঠা সকাল, আম কুড়ানো দুপুর,
দিগন্তে ছুঁটে বেড়ানো বিকেল, ধুপ ধুনোর গন্ধ জড়ানো সন্ধ্যে, তক্ষকের ডাকে
নিদ্রাহীন গা-ছমছম রাত, ভেলায় চড়ে তার ছুটে চলা মাছ ধরার উদ্দেশ্যে ।
পিসীমনি আর মায়ের সম্পর্কটা ও ছিল মিষ্টি । পিসীমনির স্বামী মারা গেলে, আমার মা, বাবার চোখে ও জল দেখেছি। ও চোখে ভালো দেখতে পেতোনা বলে, মা একটা চশমা আনিয়ে দিয়েছিলেন , খুব খুশী হয়েছিল । প্রথম প্রথম পরতে খুব ভালোবাসতো কিন্তু পরে চশমাটাকে এতো বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল যে পরতেই চাইতো না, বলতো পুরনো হলে সৌন্দর্য কমে যাবে। মা
শীতের সময় ওর জন্যে সোয়েটার , কিনে আনতেন, যেটা প্রায় প্রতিবারই শীতের
শেষে সে নিজের কোন গরীব নিকটাত্মীয়কে দিয়ে দিত , নিজের কথা চিন্তা না করে,
মা রাগ করলে ও হেসে ফেলতো , বলতো , সামনের বার আরেকটা তো পাবোই । পিসীমণির দুই ছেলে আমাকে খুব আদর করতো, বৌদি দের কাছে ও পেয়েছি অনেক ভালবাসা। ওরা আমাকে এখনো ডাকে “রিঙ্কন” নামে । দাদারা ঘুড়ি বিক্রি করতো, আর সবচেয়ে সুন্দর ঘুড়িটা তুলে রাখত আমার জন্যে, ঘুড়ি উড়ানোর চেষ্টায় ওদের বেশ কয়েকটা ঘুড়ি নষ্ট করেছি , আর ওরা হাসি মুখে মেনে নিয়েছে সব আবদার। তবে একটা দুঃখ আজ ও রয়ে গেছে মনে, এতো চেষ্টার পর ও আমি ভালো করে ঘুড়ি ওড়ানো শিখতে পারিনি । পিসীমনির কোলে চড়ে বিকেলে বেড়াতে যাওয়া সব সময়ই ছিল আমার কাছে আনন্দের। সে , পশু পাখি, প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্বের যে সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিল, সেটা কিছুটা হলে ও আমার জীবনে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে সহায়ক হয়েছে। পিসীমনি নাটাই ব্রত নামের কোনো এক ব্রত পালন করত শীতকালে, কুয়াশা ঘেরা মাঘ মাসের হিমেল রাতে, কেরোসিনের কুপী হাতে চলে
আসতো আমাদের বাড়িতে, আমার হাতে ব্রতের প্রসাদ, চালের গুড়োর তৈরি এক বিশেষ
ধরনের পিঠে তুলে দেওয়ায় জন্যে, সকাল পর্যন্ত সবুর করতে পারতো না। বাড়িতে
তখনো চালের তৈরি জিনিসে একটু খুঁতখুতে ভাব ছিল, কিন্তু সেটাই ছিল আমার
প্রিয় খাবার। আজ আর সেই জিনিস টা খুঁজে পাই না। তার গল্প বলার ভঙ্গি ছিল অসাধারন। কতবার
গল্পের ভেলায় চেপে পৌঁছে গেছি , সাত সাগরের দেশে , পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে
তেপান্তরের মাঠে, ঘুমন্ত রাজকন্যার স্বপ্নের দেশে, দৈত্য দানার সঙ্গে
সংঘর্ষে , পরীদের সাথে আকাশের খাঁজে খাঁজে লিখে গেছি শৈশবের ইতিহাস। মারা
যাওয়ার কিছুদিন আগে সে আমাকে বলেছিল , বড় হয়ে ওকে একটা চাদর কিনে দিতে, যা ও
আজীবন আগলে রাখবে, কাউকে দেবে না। কিন্তু আমি বড় হওয়ার আগেই সে চলে গেল।
পিসীর বাড়িতে ছিলাম, পিসতুতো দাদার বিয়েতে,চতুর্থ মঙ্গলের পরদিন ফিরে এসে
খবর পেলাম, আমার পিসীমনি হারিয়ে গেছে, হঠাৎ করে সে নাকি তার উঠোনে পড়ে
গিয়েছিল মাথা ঘুরে, ঘটনার দুদিন পর শিলচর মেডিক্যাল কলেজে তার মৃত্যু হয়। শেষ সময়টায় দেখা না করতে পারার কষ্ট
আমার কোনোদিনই ঘুচবে না, কিন্তু এর থেকেও বড় যে কষ্ট আজীবন বুকে ঘর বেঁধে
থাকবে , সেটা হল আমি চাদর কিনে দেওয়ার সুযোগটাই পেলাম না। পিসীমনি তোমাকে
খুঁজে পাবো সে ভাবনা ও আজ অলীক। বাস্তব জগত থেকে তুমি আজ সহস্র যোজন
দূরে, অনেকটা আকাশের তারার মতন তবু রয়েছ আমারই কাছাকাছি , মনের মণিকোঠায় ।
Friday, August 3, 2012
মনের মণিকোঠা থেকে (১)
আমার
শৈশবের প্রথম দিন,আলোছায়ার দ্বন্দে মাখামাখি সেই অবুঝ সকাল, মায়ের বুকের
কাছাকাছি মাথা রেখে পরিচয় ঘটেছিল তার সঙ্গে। সে আমার দাদু, দিদা,
ঠাম্মা,দাভাই চারজনের অভাব পূর্ণ করেছিলো নিমেষে, না হলে হয়তো আমার শৈশব
এতটা মধুর হয়ে উঠত না। একমাত্র সন্তান হিসেবে মা বাবার স্নেহ ভালোবাসা
পেয়েছি পর্যাপ্ত পরিমাণ থেকে সহস্রগুন বেশী , সেই স্নেহ মমতা ঘেরা সকাল
সন্ধ্যায় সে ছিল বিকেলের শেকল ভাঙা বাঁশি , যে আমাকে পৌঁছে দিত কল্পনা আর বাস্তবের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত দুনিয়ায়। আমাদের বাড়িতে পিসীমনি কাজ করেছে বিশ বছর, আমার জন্মের আগে আট বছর আর পরে বারো বছর, পরে তার
ছেলে দোকান খোলার পর, সে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু তখনো প্রত্যেক বিকেলে ছুটে
আসতো আমার সাথে গল্প করতে, সন্ধ্যা অব্দি বসতো, মা চা বানাতেন, সন্ধ্যা
ঘনিয়ে এলে, চা টা খেয়ে , বিদায় নিতো, আর আমরা দুজনই অপেক্ষায় রইতাম পরের
বিকেলের। “বিকাল” শব্দটাকে সে উচ্চারণ করতো “বৈকাল” বলে, “চামচ” কে বলতো
“চামিচ”। আর্থ-সামাজিক ব্যাবধান কখনো কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি আমাদের মনে, কোনো দিন ও মনে হয় নি সে আমাদের পরিবারের নয়। আমি ডাকতাম পিসীমনি বলে কিন্তু তার আর আমার সম্পর্কটা ওখানেই থেমে থাকেনি। সে আমার কাছে ছিল বিশ্বের জানালা, আমার শিশুসুলভ অনেক চঞ্চলতার একমাত্র সাক্ষী। লাল পেড়ে সাদা শাড়ী পরিহিতা সেই পঞ্চাশোর্ধা মহিলার কোলে বসেই শুনেছি কত গল্প, শুনেছি পূর্ববঙ্গেরই ( বর্তমান বাংলাদেশ) কোনো এক জায়গায়, পদ্মার ধারে ছিল তার পিত্রালয়, তিন ভাইয়ের মৃত্যুর পর জন্ম হয়েছিল বলে, যমরাজ কে ঠকানোর আশায় মা-বাবা নাম
রেখেছিলেন নিরাশা , নিরাশা মণ্ডল। পিসীমনির কথার সুর ছিল টানা টানা,
অনেকটা ঢাকা অঞ্চলের চলিত ভাষার মতন। পিসীমনির মুখে শুনেছি, তার বিয়ে
হয়েছিল আড়াই বছর বয়েসে, পাত্র ছয় বছরের। থালায় বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল
তাকে ছাঁদনাতলায় । বিয়ের
পর নাকি স্থির হয়, মেয়ে বড় হলে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে। পনেরো বছর
বয়েসে দেশ স্বাধীন হয়, তখন সেও নিজের স্বামীর হাত ধরে ভারতে চলে আসে।
পিসীমনির গর্ব ছিল তার স্বামীর ভালবাসা , স্বামীর কথা বলা মাত্র তার দুচোখ
উজ্জ্বল হয়ে উঠত, তার কাঠের একটা ছোট্ট বাক্সে বহুবার দেখেছি সযত্ন রক্ষিত
এক কৌটো সিঁদুর, তার আন্তরিক বিশ্বাস ছিল এই সিঁদুরের ওপর, বলত ছেলেবেলায় মন্ত্রপুতঃ
এই সিঁদুরই নাকি পরতে দেওয়া হত তাকে, যাতে তার স্বামীর ভালোবাসায় ভাঁটা
না পড়ে, সেই বিশেষ সিঁদুরের একটু খানি সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল সেই
বিশ্বাসেই । সে বলতো , তার দেশের বাড়ী ছিল ছবির মতন, মাটির ছোট্ট ঘর,
বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা মাটির উঠোন, সূর্য ওঠা সকাল, আম কুড়ানো দুপুর,
দিগন্তে ছুঁটে বেড়ানো বিকেল, ধুপ ধুনোর গন্ধ জড়ানো সন্ধ্যে, তক্ষকের ডাকে
নিদ্রাহীন গা-ছমছম রাত, ভেলায় চড়ে তার ছুটে চলা মাছ ধরার উদ্দেশ্যে ।
পিসীমনি আর মায়ের সম্পর্কটা ও ছিল মিষ্টি । পিসীমনির স্বামী মারা গেলে, আমার মা, বাবার চোখে ও জল দেখেছি। ও চোখে ভালো দেখতে পেতোনা বলে, মা একটা চশমা আনিয়ে দিয়েছিলেন , খুব খুশী হয়েছিল । প্রথম প্রথম পরতে খুব ভালোবাসতো কিন্তু পরে চশমাটাকে এতো বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল যে পরতেই চাইতো না, বলতো পুরনো হলে সৌন্দর্য কমে যাবে। মা
শীতের সময় ওর জন্যে সোয়েটার , কিনে আনতেন, যেটা প্রায় প্রতিবারই শীতের
শেষে সে নিজের কোন গরীব নিকটাত্মীয়কে দিয়ে দিত , নিজের কথা চিন্তা না করে,
মা রাগ করলে ও হেসে ফেলতো , বলতো , সামনের বার আরেকটা তো পাবোই । পিসীমণির দুই ছেলে আমাকে খুব আদর করতো, বৌদি দের কাছে ও পেয়েছি অনেক ভালবাসা। ওরা আমাকে এখনো ডাকে “রিঙ্কন” নামে । দাদারা ঘুড়ি বিক্রি করতো, আর সবচেয়ে সুন্দর ঘুড়িটা তুলে রাখত আমার জন্যে, ঘুড়ি উড়ানোর চেষ্টায় ওদের বেশ কয়েকটা ঘুড়ি নষ্ট করেছি , আর ওরা হাসি মুখে মেনে নিয়েছে সব আবদার। তবে একটা দুঃখ আজ ও রয়ে গেছে মনে, এতো চেষ্টার পর ও আমি ভালো করে ঘুড়ি ওড়ানো শিখতে পারিনি । পিসীমনির কোলে চড়ে বিকেলে বেড়াতে যাওয়া সব সময়ই ছিল আমার কাছে আনন্দের। সে , পশু পাখি, প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্বের যে সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিল, সেটা কিছুটা হলে ও আমার জীবনে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে সহায়ক হয়েছে। পিসীমনি নাটাই ব্রত নামের কোনো এক ব্রত পালন করত শীতকালে, কুয়াশা ঘেরা মাঘ মাসের হিমেল রাতে, কেরোসিনের কুপী হাতে চলে
আসতো আমাদের বাড়িতে, আমার হাতে ব্রতের প্রসাদ, চালের গুড়োর তৈরি এক বিশেষ
ধরনের পিঠে তুলে দেওয়ায় জন্যে, সকাল পর্যন্ত সবুর করতে পারতো না। বাড়িতে
তখনো চালের তৈরি জিনিসে একটু খুঁতখুতে ভাব ছিল, কিন্তু সেটাই ছিল আমার
প্রিয় খাবার। আজ আর সেই জিনিস টা খুঁজে পাই না। তার গল্প বলার ভঙ্গি ছিল অসাধারন। কতবার
গল্পের ভেলায় চেপে পৌঁছে গেছি , সাত সাগরের দেশে , পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে
তেপান্তরের মাঠে, ঘুমন্ত রাজকন্যার স্বপ্নের দেশে, দৈত্য দানার সঙ্গে
সংঘর্ষে , পরীদের সাথে আকাশের খাঁজে খাঁজে লিখে গেছি শৈশবের ইতিহাস। মারা
যাওয়ার কিছুদিন আগে সে আমাকে বলেছিল , বড় হয়ে ওকে একটা চাদর কিনে দিতে, যা ও
আজীবন আগলে রাখবে, কাউকে দেবে না। কিন্তু আমি বড় হওয়ার আগেই সে চলে গেল।
পিসীর বাড়িতে ছিলাম, পিসতুতো দাদার বিয়েতে,চতুর্থ মঙ্গলের পরদিন ফিরে এসে
খবর পেলাম, আমার পিসীমনি হারিয়ে গেছে, হঠাৎ করে সে নাকি তার উঠোনে পড়ে
গিয়েছিল মাথা ঘুরে, ঘটনার দুদিন পর শিলচর মেডিক্যাল কলেজে তার মৃত্যু হয়। শেষ সময়টায় দেখা না করতে পারার কষ্ট
আমার কোনোদিনই ঘুচবে না, কিন্তু এর থেকেও বড় যে কষ্ট আজীবন বুকে ঘর বেঁধে
থাকবে , সেটা হল আমি চাদর কিনে দেওয়ার সুযোগটাই পেলাম না। পিসীমনি তোমাকে
খুঁজে পাবো সে ভাবনা ও আজ অলীক। বাস্তব জগত থেকে তুমি আজ সহস্র যোজন
দূরে, অনেকটা আকাশের তারার মতন তবু রয়েছ আমারই কাছাকাছি , মনের মণিকোঠায় ।
Monday, June 18, 2012
মেঘদূত
একফোঁটা বৃষ্টির জল, আলতো ছোঁয়ায় মুগ্ধ চিবুকে।
জীবনের স্বাদ লেগে থাকে চাতকের ঠোঁটের কিনারায়।
চাঁদের টেবিলে মাথা রেখে, রাত জাগা গন্ধরাজ;
ঝরা পাতার শোকে জন্ম নেয় কবিতারা । আলোকবর্ষ দূরের কাহিনী,
আবর্তিত নটরাজের মালার স্পন্দনে।
অলকাপুরির শ্যাওলাময় দেওয়ালে , আবছা ছায়া;
জোনাকির আলোয় না বলা কাহিনী,
হাল্কা শিহরন পিয়ালের বনে।
শিপ্রার ভিজে আঁচলে হিজলের মাখামাখি ,
“আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে” কালিদাসের মেঘদূত,
ঝরে পড়ে মাছরাঙ্গার রঙিন পালকে।
Tuesday, June 12, 2012
ঝড়- পিংকি পুরকায়স্থ চন্দ্রানী
তুমিই তো বলেছিলে , সাথে থাকবো সুখে দুঃখে,
সূর্যোদয়ের সূর্যমুখী , আর অমানিশার একমুঠো জোনাকি হয়ে।
তুমিই তো বলেছিলে, আকাশের বুকে লিখে যাব নাম ,
তোমার আমার,মেঘের সাজে।
অথবা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ব,
সুন্দরের আবাহনে।
মনে পড়ে তোমার? আমার সবুজ আঁচল ভরে দিয়েছিলে,
কনক চাঁপা উপহারে।
অবেলায় গেয়েছিলে মল্লার গীতি।
কাটাকুটির ছলে, লিখে ছিলে নিজের নাম,
কাঠমল্লিকার বুকে।
যা প্রজাপতি হয়ে উড়ে গিয়েছিল,
দখিনের জানালায়।
একফোঁটা শিশির হয়ে লিখেছিল কবিতা,
চোখের পাতার আধফোটা কুঁড়িতে।
শতচ্ছিন্ন সেই প্রেমের কবিতা,রাখালিয়া বাঁশী,
ভেসে গেছে সেদিন, কাল বৈশাখী ঝড়ে।
রয়ে গেছে শুধু সবুজের ইতিহাস,
দুটো উপড়ে যাওয়া বটগাছের নিষ্প্রাণ দেহ।
সূর্যোদয়ের সূর্যমুখী , আর অমানিশার একমুঠো জোনাকি হয়ে।
তুমিই তো বলেছিলে, আকাশের বুকে লিখে যাব নাম ,
তোমার আমার,মেঘের সাজে।
অথবা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ব,
সুন্দরের আবাহনে।
মনে পড়ে তোমার? আমার সবুজ আঁচল ভরে দিয়েছিলে,
কনক চাঁপা উপহারে।
অবেলায় গেয়েছিলে মল্লার গীতি।
কাটাকুটির ছলে, লিখে ছিলে নিজের নাম,
কাঠমল্লিকার বুকে।
যা প্রজাপতি হয়ে উড়ে গিয়েছিল,
দখিনের জানালায়।
একফোঁটা শিশির হয়ে লিখেছিল কবিতা,
চোখের পাতার আধফোটা কুঁড়িতে।
শতচ্ছিন্ন সেই প্রেমের কবিতা,রাখালিয়া বাঁশী,
ভেসে গেছে সেদিন, কাল বৈশাখী ঝড়ে।
রয়ে গেছে শুধু সবুজের ইতিহাস,
দুটো উপড়ে যাওয়া বটগাছের নিষ্প্রাণ দেহ।
Thursday, May 17, 2012
ভোর কি আদৌ হবে????
চোখের জলে জন্ম তার, নাম সুরধনী,
যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা , পাপের এন্টিসেপ্টিক হাতে।
না, পাপ তোমার কমেনি বৈকি বেড়েছে ,
শুষে নিয়ে রোগের ভার সেও আজ রুগ্ন।
অবসাদের কালিমায় অবশ অন্তর , গায়ে কালশিটে ,
সেও আজ কাঁদে সব হারানোর বেদনায়।
তারা, কুন্তি, দ্রৌপদীরা খুঁজে ফেরে আশ্রয়,
সতীত্বের মহাগাথার আনাচে কানাচে।
ভোর কি আদৌ হবে, প্রশ্ন কাঁঠাল পাখীর বুকে।
যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা , পাপের এন্টিসেপ্টিক হাতে।
না, পাপ তোমার কমেনি বৈকি বেড়েছে ,
শুষে নিয়ে রোগের ভার সেও আজ রুগ্ন।
অবসাদের কালিমায় অবশ অন্তর , গায়ে কালশিটে ,
সেও আজ কাঁদে সব হারানোর বেদনায়।
তারা, কুন্তি, দ্রৌপদীরা খুঁজে ফেরে আশ্রয়,
সতীত্বের মহাগাথার আনাচে কানাচে।
ভোর কি আদৌ হবে, প্রশ্ন কাঁঠাল পাখীর বুকে।
Saturday, January 28, 2012
অপার বাঙলার জন্যে
অপার বাঙলার জন্যে, ছোট্ট একটি প্রয়াস,আমার তৈরি ছোট্ট একটি ভিডিও ," রেইনি ডে " গানটির সাথে।
Wednesday, January 25, 2012
ভাবনা
তুমি নিজের রক্তে লিখে দিয়ে গিয়েছিলে,
একটি শব্দ "স্বাধীনতা ",
আমার খাতার পাতায়।
অর্থ বুঝতে অনেক দিন লেগেছিল ,
এখনও কতটুকুই বা বুঝতে পেরেছি?
প্রতি সকাল সন্ধ্যায় ,একা একা নিরালায় ভাবতে বসি ,
এখনও কতটুকুই বা বুঝতে পেরেছি?
প্রতি সকাল সন্ধ্যায় ,একা একা নিরালায় ভাবতে বসি ,
তোমার রক্তের বিনিময়ে,
নিয়ে আসা স্বাধীনতা কি আমার কাছে সুরক্ষিত?
বড় বড় অট্টালিকার আড়ালে গড়ে উঠা,
ঘিঞ্জি বস্তির আবর্জনার স্তূপ থেকে ভেসে আসা,
লাওয়ারিস শিশুর অসহায় কান্না,
লাওয়ারিস শিশুর অসহায় কান্না,
আমার চিন্তার প্রবাহ কে তছনছ করে দিয়ে যায়।
অনাহারে মৃত্যুর হিসেব সংবাদপত্রের প্রথম পাতাটিকে ,
ভাগ করে নেয় কালো টাকার হিসেবের সাথে।
প্রজাতন্ত্রে প্রজার অধিকার শীত ঘুমে,
রাজনীতির মারপ্যাছে নির্ধারিত স্থান-কাল-পাত্রের জীবন।
বুকের ভেতর পুঞ্জিভুত বেদনা ঘর বাঁধে ।
রাতের আঁধারে ভেসে উঠে তোমার অশ্রুসজল চোখ দুটো,
তুমি হয়ত ঘৃণা করছ আমার এই অপারগতাকে,
কিন্ত সত্যি বলছি, আমি এখনও হারিনি।।
আঁধার গুহার ওপারেই নাকি আলোর বাসা,
আর আমি সেই আলোরই সন্ধানে।।
আর আমি সেই আলোরই সন্ধানে।।
Location:
Silchar, Assam, India
Wednesday, December 28, 2011
নতুন দিনের আশায়
জানি আজ আকাশে অশ্রু, বাতাসে বিষাদ, ।
তবু আমি মনে প্রানে শুষে নিতে চাই ,
একফোঁটা জীবন।
একমুঠো হাসি, এক মুহূর্ত স্বপ্ন।
তাইতো আজও আকাশে চাঁদ উঠে,
প্রজাপতিরা রঙ ছড়ায় ,ফুল ফুটে আঙিনায় ;
সেই একই আশায়।
আবার হারিয়ে যাব তেপান্তরের মাঠে,
ব্যাঙ্গমা - ব্যাঙ্গমীদের সাথে আলাপচারিতায়।
কোনও এক উদাস দুপুরে,
পুরাতনের চিহ্ন মাত্র , বইয়ের ছেঁড়া পাতায়,
স্পষ্ট হয়ে উঠবে সরল ইতিহাস,
হাতের রেখার আঁকা-বাঁকা পথের অন্তরালে ।
ছোট্ট জামায় জড়ানো শীতের সকাল,
লাল ঝুটিতে বাঁধা রঙিন বিকেল।
জেগে উঠবে, পুতুলের জন্মদিনের অর্থহীন উচ্ছাস।
ফিরে আসবে আবার গল্প শোনা রাত,
তারা গুনার ব্যস্ততা, নির্মেঘ আকাশ, ঘুমের গান।
রাত পোহালেই নতুন দিন,
ঝিঁ-ঝিঁ পোকারা ব্যস্ত হয়ে উঠে সূর্য বন্দনার সমবেত সুরে।
Location:
Silchar, Assam, India
Subscribe to:
Posts (Atom)
